About Rotnogorbha Parents

আমরা আর কোন ‘রত্নগর্ভা মা’ চাই না!
.
এ পৃথিবীর সব মা’ই তো স্পেশাল, সবার সন্তানই রত্ন! তবে আমার শাশুড়ি আম্মা একজন পদক প্রাপ্ত ‘রত্নগর্ভা মা’। ২০১৬ সালের মা-দিবসে মাননীয় স্পিকার মহোদয়ের কাছ থেকে তিনি এই সম্মাননা গ্রহণ করেন। পুরো পরিবার সহ আমারও ভীষণ গর্বের একটা উপলক্ষ এটা, কারন আম্মার জীবন সংগ্রাম এবং তাঁর সফল সন্তানদের পরিচয় উদৃত করে যে রচনাটা লিখতে হয়েছিল এপ্লিকেশনের সময়, সেটা আমার লেখা। আমি তাঁর সবচেয়ে বড় পুত্রবধূ।
আম্মাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, আটটা সন্তানকে সু-সন্তান করে মানুষ করতে এতো কষ্ট কেন করলেন জীবনভর!? আম্মা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, সে সময়ে কষ্ট হলেও গায়ে লাগে নি! সেটাতেই সুখ ছিল। তিন রুমের সরকারি কোয়ার্টারে তার আট সন্তান বড় হয়েছে চোখের সামনে। এখন দেশে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত আট ছেলেমেয়ের আট বাড়িঘর, তবুও সে আনন্দ কই! সে সময়টাতেই যেন ভালো ছিলেন!
.
জীবন সায়াহ্নে আসা যে কোন মা’কে জিজ্ঞেস করলে এই একই উত্তর পাওয়া যাবে। তারা সানন্দেই এই কষ্টগুলো করেছেন সন্তানের জন্য। এতদিনে নিজেও মা হয়েছি, নিজেও বুঝছি। সন্তান এসব ডিমান্ড করে না। যা স্যাক্রিফাইজ করার, তাদের ভালো চেয়ে যা করার, বাবা মা নিজেরাই করেন। বিশেষ করে মা! কারন, বাবা সন্তান মানুষ করার সাথে সাথে নিজের একটা ‘পরিচয়’ তৈরি করতে পারেন। বাবা বিশিষ্ট ব্যবসায়ি হন, আমলা হন, চিকিৎসক – প্রকৌশলী- শিক্ষক … অনেক কিছু হতে পারেন। কিন্তু মা, শুধুই মা থেকে যান। তার সাফল্য বা তাঁকে আদৌ ‘রত্নগর্ভা’ ডাকা হবে কিনা, এটা নির্ভর করে কেবল সন্তানদের স্ট্যাটাসের উপর! তিনি কেমন সফল মা, যেমন সফল সন্তান! তাহলে কি উনার আর কোন পরিচয় থাকতে নেই বয়স যখন সত্তর? জীবন যখন প্রায় শেষ!
.
স্রেফ উদাহরন হিসেবেই বলি, আমার প্রয়াত মামা শ্বশুরদের একজন চিটাগাং মেডিকেল থেকে পাস করা চিকিৎসক – আরেকজন ময়মন্সিং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট সরকারি কৃষিবিদ ছিলেন। এই মেধাবী ভাইদের বোন হিসেবে আমাদের আম্মাও অবশ্যই একই মেধা ধারন করতেন। সুযোগ পেলে তিনি হয়ত আজকে হতেন কোন হাই স্কুলের নামকরা প্রধান শিক্ষিকা, তিনি একজন চিকিৎসকও তো হতে পারতেন! আরও না জানি কত কিছু যৌক্তিক কল্পনায় আনা যায়। কিন্তু না, তাঁকে আমরা সম্মননা দিতে পারছি শুধু তার সন্তানদের কারনে। আর্কিটেক্ট, বোটানিস্ট, ডাক্তার, নগর পরিকল্পনাবিদ, চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট – হয়ে তার রত্নেরা তাঁকে মুল্যায়িত করেছে বলে।
এক জীবনে আসলে এর চেয়ে সফল আর কেউই হয় না, কিন্তু কখনো কি জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের আম্মা নিজের জন্য কিছু চেয়েছিলেন কিনা! তার নিজের কোন স্বপ্ন ছিল কিনা! উনি তো মেয়েদেরকেও একই রকম পড়িয়েছিলেন, পুত্রবধূও উচ্চ শিক্ষিতা পছন্দ করেছেন, তিনিও কি চাইতেন, আমরা তার মত প্রচন্ড সংগ্রামের একটা জীবন ধারন করি?
নিশ্চয়ই না। অবশ্যই তিনিও চান আমাদের যার যার একটা পরিচয় হোক! তার মানে, নিজের বেলায় যদি সম্ভব হত, উনিও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চাইতেন।
.
একটা সময় ছিল, যেটা আমাদের শাশুড়ি – আমার নানুমনি, তারা পার করেছেন। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙ্গালী পরিবার। সেখানে মায়ের ভূমিকা, সন্তানদের পালন করা পর্যন্তই ছিল। এই কাজকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ আমার নাই, কারন আমি সজ্ঞানে অনুভব করছি, এটা কি পরিমান কঠিন কাজ! তারা সংসার মেইন্টেইন করতেন, কে কি খাবে, কে কি পরবে, কার কি অসুখ, কার কি পরীক্ষা – সব কিছু! একেকটা দিন যেন কুরুক্ষেত্র! এটাই স্বাভাবিক ছিল। একটু অবসর পেলেই নানা নাশ্তা বানিয়ে রাখা, সেলাই করা, বাগান করা। এক দন্ড বিরাম তাদের ছিল না। শুধু চাকরি করাকেই গ্লোরিফাই করছি না। চাকরি না করুক, তাঁদেরকে একটু শখ পুরনের সুযোগও আমরা দিতে পারি নি।
তারা হয়ত বই পড়তে ভালোবাসেন, গান শুনতে, ঘুরে বেড়াতে – কিন্তু কিছুই করতে পারে নি। সন্তানদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে এমন কিচ্ছুই করতে বিলাসিতা করেন নি। তারা পূজনীয়, আল্লাহ্ তাদের উপযুক্ত প্রতিদান দেবেন। কিন্তু ভেবে দেখুন, এমন একটা জীবন, যে জীবন নিজের জন্য কিছুই ভাবতে পারল না – এই চক্র আজন্ম চলুক, তাই কি আমরা চাই! আমাদের কন্যা, ভগ্নি, স্ত্রী’র জন্যেও কি একদিন ‘রত্নগর্ভা মা’ বলে স্বীকৃতি পাবার জন্য, এই একই জীবনধারা আমরা চাই? এই ২০২১ এও এসে কি পৃথিবী এখনো ১৯৬১ তে পড়ে থাকবে!
.
উন্নত বিশ্বে ‘রত্নগর্ভা মা’ বলে কোন কনসেপ্ট নাই। কারন তাদের সবাই সমান সুযোগ সুবিধা নিয়ে বড় হয়। সেখানে সবাইকে কাজ করতে হয়। পিচ্চি পিচ্চি বাচ্চারা নিজের কাজ নিজে করে। ছেলে মেয়ে সবাই কাজ করে, ঘরে বাইরে সমান তালে। সেখানে রোজ রোজ রান্নার জন্য, বাসন ধোয়ার জন্য, বাচ্চাদের লালন পালনের জন্য ‘মা’ এর মত মহামূল্যবান একজন ব্যক্তিত্বের গোটা জীবনটাই খরচ করে ফেলা হয় না! বিনিময়ে তাদের সবাই রত্ন না হতে পারুক, ‘সুনাগরিক’ হয়। তারা নিয়ম মানে, সাম্যতা মানে, অপরাধপ্রবনতা কম থাকে।
বিদেশে সন্তানদের মধ্যে নাকি বাবা মায়ের জন্য মমতা থাকে না, তাদের পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় না, এটা আমাদের দীর্ঘ মেয়াদি একটা মনগড়া ভুল ধারনা। এই ভুল ধারনা পেয়ে বসায় আমরা আমাদের পিতার জীবন ছাই করে, নিজের জীবন আলোকিত করি, মায়ের দেহ কুরে খেয়ে নিজে পুষ্ট হই! এবং এই চক্র আজন্ম চলবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমরা এভাবেই আমাদের সমাজকে পরিচালিত করবো, সেটা ভেবে নেই!
.
এটা ২০২১, এখন নি আমরা বলতে পারি না, আমরা আর কোন ‘রত্নগর্ভা মা’ আর ‘গৃহলক্ষ্মী স্ত্রী’ চাই না! আমরা এখন একজন শিক্ষিতা মা’কেই সমাজের রত্ন হিসেবে দেখতে চাই। আর কোন মায়ের স্বপ্ন –ইচ্ছা- আত্মপরিচয় বলি দিয়ে, তাঁকে দিয়ে জনমভর খাটিয়ে নিজেদের জীবন উজ্জ্বল করতে চাই না। আর কোন স্ত্রীর স্বপ্ন –ইচ্ছা- আত্মপরিচয় বলি দিয়ে, তাঁকে দিয়ে জনমভর খাটিয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে গৌরবান্বিত করতে চাই না!

About the Author:

Developer Herwill

Developer Herwill

Leave a Reply

Your email address will not be published.