Personal Story

সময়টা ১৯৯৯ সালের প্রথম দিক। হঠাৎ করেই আমার বড় ছেলে রিয়াসাত বলতে শুরু করলো, আম্মু সবাইদের দুইটা বাচ্চা তোমার কেন একটা? সবাইদের আম্মুরা স্কুলে ওদের আরেকটা বাচ্চা নিয়ে আসে, তুমিতো একা যাও! রিয়াসাত তখন প্রথম শ্রেনীতে পড়ছে। প্রথমে আমি ওর কথায় খুব একটা মনোযোগ দেইনি তবে ও যখন সারাক্ষণই একই কথা বলতে লাগলো তখন আমি রিসুর সাথে  (আমি ওকে  রিসু নামে ডাকি) আলাপ করে বুঝতে পারলাম,  ওর সহপাঠীদের মায়েরা যখন স্কুল ছুটির পর  ওদের নিতে বা সকালে স্কুলে দিতে আসে তখন সাথে করে ছোট ভাই বা বোনকেও  নিয়ে আসে কিনতু আমি একা ওকে স্কুলে দিতে ও স্কুল থেকে নিয়ে আসতে যাই। তার মানে আমাকে আর একটা বাচ্চা নিতে হবে আর এই বাচ্চা নেয়ার কথা আমিতো ভুলেই গিয়েছিলাম! রিসুই আমাকে মনে করিয়ে দিল। কথাটা আমি রিসুর বাবা মানে রাশেদকে জানাবার সাথেই ও জিজ্ঞাসা করলো আমি দ্বিতীয়বার প্রেগনেন্ট হতে রাজী কিনা। কারন প্রথম প্রেগন্যান্সির সময় আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। তাই রাশেদ সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে বললো। আমিও বেশ দ্বিধায় পড়ে গেলাম, পারবো কি আমি আবারও সেই কষ্টের পথ অতিক্রম করতে! তাছাড়া আমি ওই সময় একটা কোর্স করছিলাম আর রাশেদও চাকুরীর পাশাপাশি ওর মাষ্টার্স নিয়ে বেশ ব্যস্ত! এদিকে  সারাদিন রিসুর সেই একই কথা ওর একটা খেলার সাথী লাগবে। আমার যতদুর মনে পড়ে আমি সিদ্ধান্ত নিতে বেশ কয়েকমাস সময় নিয়েছিলাম। কোর্সের শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে এসে মানুষিকভাবে নিজেকে শক্ত করে  রাশেদকে জানালাম আরেকটা বাচ্চা পৃথিবীতে আনার জন্য কষ্ট সহ্য করতে আমি তৈরী!

১৯৯৯ সালের মে মাসের দিকে নিশ্চিত হলাম আমি   প্রেগনেন্ট। খবরটা শুনে রিসু যে কি খুশি হয়েছিল আমি সেটা প্রকাশ করার মতো কোন ভাষা আমার জানা নেই! তবে মা ছেলের মধ্যে ঝগড়ার সূত্রপাতও  হলো সাথে সাথে। ও চায় একটা ভাইয়া যার সাথে ফুটবল খেলবে আর আমি চাই মেয়ে এবং তার সাথেই রিসুকে ফুটবল খেলতে হবে। আমি সত্যিই মনপ্রাণ দিয়ে একটা মেয়ে চেয়েছিলাম এবং আমার মেয়েই হবে এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে নামও ঠিক করে রেখেছিলাম। প্রেগন্যান্সির দুমাস হতেই আমি খুবই অসুস্হ হয়ে পড়লাম তার সাথে রাক্ষুসে ক্ষিধা! একটু পর পর খেতাম এবং সারাক্ষণই শুয়ে থাকতাম, আর যখনই একটু সুস্হ বোধ করতাম তখনই যা পারতাম রান্না করে ফেলতাম তার সাথে যোগ হতো বাইরে থেকে কেনা খাবার! রিসু আর সংসারের সব  দায়িত্ব রাশেদ নিজের কাঁধে তুলে নিল। প্রথমবার বাসার কাছের পলি ক্লিনিকে চেকআপের জন্য গিয়েছিলাম। তবে শারীরিক অবস্হার কারনে দ্বিতীয়বার চেকআপের জন্য যাওয়ার পর ডাক্তার আমাকে হাসপাতালে রেফার করে দিল এবং তারপর থেকে নিয়মিত চেকআপের জন্য কে কে হাসপাতালে (k k women’s and children’s hospital, Singapore) যেতে শুরু করলাম। চেকআপের দিনগুলোতে রাশেদ আমার সাথে যেতো তবে বাচ্চার জেন্ডার পরীক্ষার দিন আমি ইচ্ছা করেই রিসুকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। টেকশিয়ান(মহিলা) যখন আলট্রাসাউনড করছিল তখন রিসু খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। তারপর একটা সময় উনি বলে উঠলেন, it’s a boy’! হয়তো আশা ভংগের কারনেই আমি নিস্পৃহ গলায় শব্দ করে উঠলাম oh!  শুনে উনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, why are you not excited? Cos you have a boy already! আমি শুধু বলেছিলাম, I just wanted a girl! আর রিসু ওর বিশাল দুচোখ আরও বিশাল করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, বলেছিলাম না আমার একটা ভাইয়া হবে! আর এভাবেই রিসু আর আমার মধ্যে ঝগড়ার  পরিসমাপ্তি ঘটলো।

বাসায় ফিরার পর আমার প্রথমেই মনে হলো এবার আমাকে অনাগত ছেলের নাম ঠিক করতে হবে। রিসুর কাছ থেকে ওর ক্লাসের ব্রসিউরটা চেয়ে নিলাম। ইজওয়ান নামটা আমি ওখানেই পেয়েছিলাম। এদিকে  আগের চেয়ে আমি অনেক সুস্হ বোধ করতে লাগলাম। আমাদের তিনজনের দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই চলে যাচছিল তবে সেটা বেশিদিন আর রইল না। সেদিনটা রাশেদ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিল। কেন যে ছুটি নিয়েছিল সেটা একেবারেই ভুলে গিয়েছি! সেদিন সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। সকালবেলা রাশেদ রিসুকে স্কুলে দিয়ে আসলো আবার ছুটির পর ওকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে গেল। সেই সময়টা কেন জানি আমার খুব অস্থির লাগছিল! স্কুল বাসার খুবই কাছে, সময় চলে যাচ্ছিল তবুও ওরা ফিরছিল না। তারপর একসময় রিসুকে সাথে করে ওর একজন শিক্ষিকা এলেন, আমাকে বললেন, রাশেদকে এম্বুলেন্সে করে Alexandra হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সাথে সাথে রিসুকে নিয়ে আমি ছুটলাম Alexandra হসপিটালের দিকে।

About the Author:

Developer Herwill

Developer Herwill

Leave a Reply

Your email address will not be published.